পাহাড়ে অবরোধ ঘিরে গোলাগুলি, থমথমে সাজেকে পর্যটন ব্যবসায় ধস
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে আঞ্চলিক সংগঠনের অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বৃহস্পতিবার অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এর পর থেকে সাজেক ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নিরাপত্তার কারণে সাজেকে আটকা পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। এতে পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন, জনজীবন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গোলাগুলি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
সেনাবাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা গুলি চালায়।
অন্যদিকে ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীই একতরফাভাবে গুলি চালিয়েছে।
অবরোধ কর্মসূচির সঙ্গে ইউপিডিএফের ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হলেও, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং গোলাগুলি কীভাবে শুরু হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
জনশূন্য গঙ্গারাম, অবরোধ অব্যাহত
বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর সাজেকের গঙ্গারাম এলাকায় জনশূন্য পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আতঙ্কে অনেকে বাড়িঘর ও দোকানপাট ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা।
তিনি জানান, শুক্রবারও সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলেছে। সকালে বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার ও গাছের গুঁড়ি জ্বালিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে সড়ক অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও শুক্রবার নতুন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে: পুলিশ
রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব জানিয়েছেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযানও চলছে বলে জানান তিনি।
বন্ধ সাজেক, ক্ষতির মুখে পর্যটন ব্যবসা
নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এতে পর্যটননির্ভর রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম। অবরোধ ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় অনেক বুকিং বাতিল করতে হয়েছে এবং পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। এতে প্রায় ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেক সড়কে চলাচল করত। বর্তমানে সেগুলো বন্ধ রয়েছে।
শুধু পর্যটন খাত নয়, সড়ক অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং জুমের ফসল বাজারজাত করাও ব্যাহত হচ্ছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, পর্যটন বন্ধ থাকায় কটেজ মালিকদের পাশাপাশি পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষও আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খুলে দেওয়ার দাবি
সাজেক পর্যটনকেন্দ্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুলে দেওয়ার দাবিতে শুক্রবার খাগড়াছড়ি জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
সরকারি কলেজ গেটের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, পর্যটন খাত এ অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পর্যটন বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দ্রুত সাজেক খুলে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ইটাব) সদস্য উজ্জ্বল দে বলেন, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার করে পর্যটনকেন্দ্র চালুর দাবি জানান তিনি।
বর্তমানে সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অবরোধ এবং পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকার কারণে স্থানীয় জনজীবন ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
sajek-gunfire-blockade-tourism-business-crisis
🎯 Focus Keyword
সাজেকে গোলাগুলি
