Top News

তত্ত্বাবধায়ক থেকে ইভিএম: বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের উত্থান-পতনের ৫০ বছর



# বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ইতিহাস, ফলাফল ও রাজনৈতিক অধ্যায়

**স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মোট ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি দুইবার নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের সুযোগ পায়।**

প্রতিটি নির্বাচনই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কখনো উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ভোট, কখনো বিতর্ক ও কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন— সবকিছু মিলিয়েই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। আসুন, এক নজরে দেখে নিই দেশের ১২টি সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস ও ফলাফল।


---

## প্রথম সংসদ নির্বাচন (১৯৭৩): স্বাধীন দেশে প্রথম ভোট

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি মো. ইদ্রিসের নেতৃত্বাধীন [নির্বাচন কমিশন](/নির্বাচন-কমিশন) এই ভোট পরিচালনা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

তবে এই নির্বাচন পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিরোধী দলগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কারচুপির অভিযোগ তোলে। নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু ২৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের জাতীয় ট্র্যাজেডিতে এই সংসদের অকাল সমাপ্তি ঘটে।


---

## দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৭৯): সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফেরা

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭৫-এর পর দেশ দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক পোশাক ত্যাগ করে [বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি](/বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।

বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত এই ভোটে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ (মালেক অংশ) ৩৯টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।


---


## তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচন (১৯৮৬-১৯৮৮): এরশাদ আমলের বিতর্কিত ভোট

১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তার শাসনকে গণতান্ত্রিক রূপ দিতে ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেন। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। তবে ভোট চলাকালেই ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগ। [জাতীয় পার্টি](/জাতীয়-পার্টি) ১৫৩টি আসন পেলেও এই সংসদের নৈতিক ভিত্তি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচন আরও বিতর্কিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি— উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলই নির্বাচন বর্জন করে। তথাকথিত ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ নিয়ে গঠিত এই সংসদ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এরশাদের এই নির্বাচনের মাধ্যমেই পরবর্তীতে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পথ সুগম হয়।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে এরশাদের পদত্যাগের মাধ্যমে নয় বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং নির্দলীয় [তত্ত্বাবধায়ক সরকার](/তত্ত্বাবধায়ক-সরকার) ব্যবস্থার সূচনা হয়।


---

## পঞ্চম সংসদ নির্বাচন (১৯৯১): তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম ভোট

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি মাইলফলক। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।

বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে। পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এই সংসদ প্রায় পূর্ণ মেয়াদ অতিক্রম করেছিল।


---

## ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬): একতরফা ভোট ও স্বল্পস্থায়ী সংসদ

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকারের অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে একতরফা এই ভোটে অধিকাংশ আসনেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।

কেন্দ্র দখল ও ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগে জর্জরিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী। নৈতিক চাপের মুখে এই সরকার দ্রুত পতনের মুখে পড়ে।


---


## সপ্তম সংসদ নির্বাচন (জুন ১৯৯৬): আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন

ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাত্র চার মাস পর, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম সংসদ নির্বাচন। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এই ভোট ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ।

দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জাতীয় পার্টি ও জাসদের সমর্থনে সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত এই সরকারই প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার যা পূর্ণ মেয়াদ অতিক্রম করে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।


---


## অষ্টম সংসদ নির্বাচন (২০০১): উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে বিএনপির জয়

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে ব্যাপক রদবদল ঘটালে আওয়ামী লীগ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং চার দলীয় জোট সরকার গঠন করে।


---


## নবম সংসদ নির্বাচন (২০০৮): ১/১১-এর পটভূমিতে আওয়ামী লীগের জয়

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ২০০৬-২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট ও ১/১১ নামে পরিচিত সামরিক হস্তক্ষেপের পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই নির্বাচন আয়োজন করে।

দীর্ঘ দুই বছর অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


---


## দশম সংসদ নির্বাচন (২০১৪): তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল ও বিএনপির অনুপস্থিতি

ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। বিএনপি এই সংশোধনীর বিরোধিতা করে এবং সংসদ অধিবেশন বর্জন করে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করা হয় এবং বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে। ফলে আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসন পেয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দেশে-বিদেশে এই নির্বাচন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।


---

## একাদশ সংসদ নির্বাচন (২০১৮): ইভিএম ও কারচুপির অভিযোগ

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে [ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম](/ইভিএম) ব্যবহার করা হয়।

নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে সরকার এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত করে কারাগারে পাঠানো হয়। ভোটের দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে। আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি জোট সংসদের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে।


---

## দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন (২০২৪): শেখ হাসিনার টানা চতুর্থ মেয়াদ

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে এবং জামায়াতে ইসলামী ততদিনে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল। ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠনের সুযোগ পায়।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীতে পরিণত হন। তবে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় দেশ কার্যত একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।


---

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস গণতন্ত্রের চর্চা ও সংকটের এক জীবন্ত দলিল। ১৯৭৩ সালের উৎসবমুখর ভোট থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন— প্রতিটি অধ্যায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উত্থান-পতন, ইভিএম প্রযুক্তির ব্যবহার, নির্বাচন বর্জনের রাজনীতি— সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখনও একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও সবার জন্য আস্থার নির্বাচন ব্যবস্থার প্রত্যাশায় রয়েছে।


**ছবি:** সংগৃহীত

#ElectionBD #BangladeshElection #ParliamentElection #BDPolitics #AwamiLeague #BNP #JatiyaParty #BangladeshHistory #DemocracyBD








তত্ত্বাবধায়ক থেকে ইভিএম: বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের উত্থান-পতনের ৫০ বছর

 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন