ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য: জামায়াতের ইশতেহারে ২৬ অগ্রাধিকার ঘোষণা
ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য: জামায়াতের ইশতেহারে ২৬ অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার। দলটি “জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ” স্লোগান সামনে রেখে ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন সময়ের গণআন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং ভবিষ্যতে একটি নৈতিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নতুন নেতৃত্ব, মেধা ও উদ্ভাবনভিত্তিক চিন্তার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার পরিকল্পনা করছে দলটি।
ইশতেহারের মূল লক্ষ্য
জামায়াতের ঘোষিত ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারসহ নানা খাতে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। দলটির দাবি, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
২৬টি অগ্রাধিকার বিষয়
১. আপসহীন রাষ্ট্র গঠন
স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২. বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা
ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
৩. যুব নেতৃত্বের বিকাশ
রাষ্ট্র পরিচালনায় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. নারীর নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ
নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৫. আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন
মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
৬. প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র
স্মার্ট ও আধুনিক সমাজ গঠনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
৭. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি ও উৎপাদন খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হয়েছে।
৮. সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা
বিনা মূল্যে আবেদন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৯. আর্থিক খাত সংস্কার
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
১০. নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার
সমানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি ও শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
১১. কৃষি উন্নয়ন
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১২. খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা
২০৩০ সালের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৩. শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
১৪. শ্রমিক কল্যাণ
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৫. প্রবাসীদের অধিকার
প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
১৬. সমান নাগরিক অধিকার
ধর্ম বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
১৭. স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন
সবার জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৮. শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ধাপে ধাপে বিনামূল্যে শিক্ষার কথা বলা হয়েছে।
১৯. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
২০. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
২১. সাশ্রয়ী আবাসন
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
২২. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ
চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখে ফ্যাসিবাদ পুনরায় প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
২৩. সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সব নাগরিকের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
২৪. সুশাসন প্রতিষ্ঠা
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
২৫. সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা
নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২৬. কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
সুখী, সমৃদ্ধ ও জনবান্ধব রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ইশতেহার ঘোষণার সময় দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা। একই সঙ্গে জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথাও তুলে ধরা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইশতেহার দেশের বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বহন করছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনগণের সমর্থনের ওপর।
