Top News

নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ: র্যাপার থেকে রাষ্ট্রনায়ক | ইতিহাস গড়া জেন-জি নেতা




# গানের সুর থেকে শপথপত্র: নেপালের ইতিহাস গড়া ‘জেন-জি’ প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ


---

ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর রাষ্ট্রপতি ভবনে যখন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তখন শুধু নেপাল নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। তাঁর হাতে শপথবাক্য পড়ানোর সময় ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিট— জ্যোতিষীরা যাকে শুভ মুহূর্ত বলে চিহ্নিত করেছিলেন । এই শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে নেপাল শুধু একজন নতুন শাসকই পেল না, পেল এক নতুন সম্ভাবনার নাম, যার হাত ধরে ক্ষমতার মসনদে উঠে এলো এক প্রজন্ম, যারা এখন পর্যন্ত রাজনীতির প্রান্তিক পর্যায়ে ছিল।

বালেন্দ্র শাহ, যিনি সাধারণ মানুষ ‘বালেন’ নামেই বেশি চেনেন, তিনি শুধু নেপালের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি সেই ব্যক্তি যিনি একজন র্যাপার, একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, একজন মেয়র থেকে সরাসরি হয়ে উঠলেন একটি জাতির নেতা। আর তাঁর অভিষেক ঘিরে উত্তেজনা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি নিজেই— শপথের আগের দিন প্রকাশিত তাঁর নতুন র্যাপ গানে তিনি বলে গেলেন, **“একতাবদ্ধ নেপালি, এই সময় ইতিহাস তৈরি হচ্ছে”** ।


## কে এই ‘বালেন’? র্যাপার থেকে রাষ্ট্রনায়ক

বালেন্দ্র শাহের জন্ম ১৯৯০ সালে। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের কষ্ট, কাঠমান্ডুর যানজট, অনিয়ম আর বৈষম্য যেন তাঁকে ডেকে নিল অন্য এক পথে।

দিনের বেলায় ইঞ্জিনিয়ারিং চর্চা আর রাতে তিনি হয়ে উঠতেন র্যাপার ‘বালেন’। ২০১২ সালে ‘সড়ক বালক’ গান দিয়ে যাত্রা শুরু। তাঁর গানের কথা ছিল সরাসরি, ছিল বিদ্রোহী। তিনি ‘নিরবের কণ্ঠস্বর’ হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন, আর দ্রুতই তিনি তরুণদের আইডলে পরিণত হন। ফেসবুকে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ, অথচ দেশের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৩ কোটি । তিনি মিলেনিয়াল, কিন্তু জেন-জি-রা (১৯৯৭-২০১২ সালে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) তাঁকে দেখে নিজেদের প্রতিফলন খুঁজে পায়— একজন রাজনৈতিক ‘বহিরাগত’, যিনি পুরনো ধাঁচের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।

২০২২ সালে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে ডুব দেন। কাঠমান্ডুর মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে তিনি প্রচলিত ধারার প্রার্থীদের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন। জয়ী হয়ে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল মেয়র পরিষদের বৈঠক সরাসরি সম্প্রচার করা— স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ।


## যে ঝড় বদলে দিল নেপালের রাজনীতি

বালেন্দ্র শাহের এই অভাবনীয় উত্থানের পেছনে আছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই উত্তাল সময়। নেপালের ইতিহাসে ‘জেন-জি বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত এই আন্দোলন দেশের রাজনীতির চেহারা পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। চাকরির অভাবে হতাশ তরুণরা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই আন্দোলন এতটাই তীব্র হয় যে, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া প্রবীণ নেতা কে.পি. শর্মা অলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয় ।

সেই আন্দোলনের সময় বালেন্দ্র শাহ নিজে সামনে না এলেও তাঁর গান ‘নেপাল স্মাইলস’ হয়ে উঠেছিল তরুণদের অনুপ্রেরণা। ইউটিউবে সেই গান দেখা হয়েছিল কয়েক মিলিয়ন বার । প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যখন রাজপথ উত্তাল, তখন তরুণরা ‘বালেনের’ গানের কথায় নিজেদের অধিকার আদায়ের শপথ নিচ্ছিল।

এই বিদ্রোহের ফলেই নেপালের রাজনীতিতে পুরনো তিনটি দল— নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল (অলি) এবং সিপিএন (মাওবাদী কেন্দ্র)— ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষমতায় আসে নতুন মুখ। আর সেই নতুন তরঙ্গের নেতৃত্বে আসেন বালেন্দ্র শাহ ।


## একচ্ছত্র জয়, একক সরকার

গত ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) এককভাবে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। ২৭৫ আসনের মধ্যে তারা পায় ১৮২টি আসন, যা নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনো একক দলের সবচেয়ে বড় জয় । এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলির নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র ঝাপাতেও বালেন্দ্র শাহ তাকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে দেন । এটি ছিল এক ধরণের রাজনৈতিক ‘শেষ্ঠীপুরাণ’— যেখানে পুরনো ধারার রাজনীতিকে তরুণ ভোটাররা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন।

শপথ নেওয়ার পর পরই বালেন্দ্র শাহ ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নারীদের জন্য পাঁচটি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দিয়ে তিনি অন্তর্ভুক্তির বার্তা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অর্থনীতিবিদ স্বর্ণিম ওয়াগলে, আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন শিশির খানাল ।


## চ্যালেঞ্জ: শুধু জনপ্রিয়তাই কি যথেষ্ট?

রাজনীতিতে বালেন্দ্র শাহর যাত্রা যতটা জোয়ার-স্রোতের মতো, তার সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ২০২২ সালে মেয়র থাকাকালে একটি বিলাসবহুল ল্যান্ড রোভার গাড়ি নিয়ে বিতর্কে জড়াতে হয়েছিল তাঁকে। সমালোচনা উঠেছিল, একজন ‘জনতার নেতা’ কীভাবে এত দামি গাড়ি চালান? পরে জানা যায়, গাড়িটি নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ভাড়া করা হয়েছিল ।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি আসছে বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে গত বছরের সেপ্টেম্বরের সহিংসতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলি ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে । এই প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করা হবে কি না, তা দেখার বিষয়।

অধিকন্তু, বালেন্দ্র শাহর নিজের দলের সঙ্গেও কিছু জটিলতা রয়েছে। তাঁর দলের প্রতিষ্ঠাতা রবি লামিছানে বর্তমানে নানা আইনি জটিলতায় জড়িয়ে আছেন, যার মধ্যে জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। লামিছানে গত বছর কিছুদিন জেলে ছিলেন । এই অবস্থায়, যেখানে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন, সেখানে তাঁর নিজের দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা তাঁর জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা আর গানের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলা যায় না। নেপালের অর্থনীতি চরম সংকটে। দেশের যুবসমাজের বিশাল অংশ কাজের সন্ধানে বিদেশ পাড়ি জমায়। প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৩ শতাংশের ঘরে। দেশের ৩ কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রশ্নে এখন বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে হবে তাঁকে ।


## প্রতীকী শপথ, বাস্তবের যুদ্ধ

বালেন্দ্র শাহের শপথ গ্রহণ শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষমতা গ্রহণের অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ১৯৯০ সাল থেকে নেপালে ৩২টি সরকার হয়েছে, কিন্তু কোনো সরকারই পুরো পাঁচ বছর মেয়াদ পায়নি । স্থিতিশীলতা নেপালের জন্য অভিশাপের মতো। এই অভিশাপ ভাঙার দায়িত্ব এখন পড়েছে একজন সাবেক র্যাপারের কাঁধে।

শপথের দিন তিনি পরে ছিলেন ঐতিহ্যবাহী নেপালি পোশাক ‘দৌরা সুরুওয়াল’ ও কালো টুপি। চোখে কালো চশমা— এটুকুই তাঁর চেনা ইমেজ। এই ইমেজ নিয়েই তিনি এখন ‘সিংহ দরবার’ (নেপালের প্রধান সরকারি কমপ্লেক্স) এ প্রবেশ করলেন, যেখানে একসময় তিনি তাঁর ক্ষোভ জানিয়ে পোস্ট করেছিলেন, “যদি সরকার আমাদের কাজে বাধা দেয়, তাহলে আমি সিংহ দরবারে আগুন লাগিয়ে দেব” । সেই পোস্ট মুছে ফেললেও, আজ তিনি সেই একই সিংহ দরবার থেকে দেশ চালাবেন।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক যেমনটি মন্তব্য করেছেন, তাঁর আসল পরীক্ষা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিতে— তিনি কি জনপ্রিয়তার জোরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করবেন, নাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তাঁর জনপ্রিয়তাকে টিকিয়ে রাখবেন ?


## উপসংহার: একটি নতুন সূর্যের অভ্যুদয়

নেপালের ইতিহাসে ২৭ মার্চ একটি মাইলফলক দিন। এই দিনে এক যুবক, যিনি একসময় রাস্তার অবিচার নিয়ে গান লিখতেন, তিনি এখন সেই অবিচার দূর করার আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পেলেন। ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিদ্রোহ তাঁকে ক্ষমতার চূড়ায় বসিয়েছে।

বালেন্দ্র শাহ হয়তো এখনো ‘প্রমাণ’ করার পর্যায়ে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতার অভাব, মেয়াদকালীন কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত— সব মিলিয়ে তাঁর পথ মসৃণ নয়। কিন্তু আজকের নেপাল, যে নেপাল প্রতিবারই ভেবেছিল ‘আগামীকাল হয়তো ভালো হবে’, সেই নেপাল আজ ‘বালেন’ নামের একজনকে তাদের আস্থার প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সবশেষে তাঁর গানের সেই কথায় ফিরে যাওয়া যাক:

**“আমার বুক সাহসে ভরা, আমার লাল রক্ত ফুঁড়ে বেরোচ্ছে; আমার ভাইয়েরা আমার সাথে দাঁড়িয়েছে, এইবার আমরা জেগে উঠব।”**

আশা করা যায়, নেপালের এই নতুন অধ্যায় সত্যিই জেগে ওঠার গল্প লিখবে। শুভ হোক নেপালের নতুন যাত্রা।


---


**আপনার মতামত জানান:** এই নতুন নেতৃত্ব সম্পর্কে আপনার কী ধারণা? মন্তব্যে জানাতে পারেন।


 #Nepal #BalendraShah #YoungestPrimeMinister #GenZ #NepalPolitics #Balen #RapperTurnedPolitician #SouthAsia

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন